বিক্রমপুরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিত্বদের মধ্যে এশিয়াজুড়ে সবচেয়ে বেশি পরিচিত অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞান। তিব্বতে তিনি ‘জোবো অতীশ’ নামে স্মরণীয়, যাঁর শিক্ষা তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের একটি প্রধান ধারাকে গড়ে দিয়েছে।

বজ্রযোগিনীতে জন্ম

অতীশের জন্ম আনুমানিক ৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে; কোনো সূত্রে ৯৮০ বা ৯৮৩ সাল উল্লেখ আছে। বাংলাপিডিয়া ও অধিকাংশ আধুনিক বিবরণ অনুযায়ী তাঁর জন্ম বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে, যা এখন মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলায়। তাঁর পিতৃদত্ত নাম চন্দ্রগর্ভ, পিতা কল্যাণশ্রী ও মাতা প্রভাবতী। বজ্রযোগিনীর একটি স্থান আজও স্থানীয়ভাবে ‘নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা’ নামে পরিচিত।

এই শনাক্তকরণ নিয়ে বিতর্কও আছে। তিব্বতি জীবনীগুলোতে বলা হয়েছে, তিনি বাংলার ‘জাহোর’ নামের দেশের এক রাজকীয় নগরে জন্মেছিলেন। অনেক পণ্ডিত সেই নগরকে বিক্রমপুর বলে শনাক্ত করেন। তিব্বতি গ্রন্থ নিয়ে গবেষণা করা ব্রিটিশ আমলের পরিব্রাজক ও পণ্ডিত শরৎচন্দ্র দাস উনিশ শতকের শেষ দিকে বাঙালি পাঠকের মধ্যে এই মত ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখেন। অন্য কিছু ঐতিহ্যে জাহোরকে ভারতের অন্য অঞ্চলে বলা হয়। রঘুরামপুর ও নাটেশ্বরে সাম্প্রতিক খনন প্রমাণ করেছে যে তাঁর সময়ে বিক্রমপুর বড় বৌদ্ধ কেন্দ্র ছিল, যদিও এখন পর্যন্ত পাওয়া কোনো লিপিতে অতীশের নাম নেই।

পণ্ডিত, শিক্ষক ও অধ্যক্ষ

অতীশ পূর্ব ভারতে কয়েকজন গুরুর কাছে শিক্ষা নেন, তারপর প্রায় বারো বছর সুবর্ণদ্বীপে, যা সাধারণত সুমাত্রা বলে শনাক্ত করা হয়, আচার্য ধর্মকীর্তির কাছে অধ্যয়ন করে আনুমানিক ১০২৫ সালে ফেরেন। পরে তিনি বর্তমান বিহারের বিক্রমশীলা মহাবিহারের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক এবং পরে প্রধান হন। এটি ছিল পাল রাজ্যের বড় বৌদ্ধ বিদ্যাপীঠগুলোর একটি।

তিব্বতযাত্রা

পশ্চিম তিব্বতের শাসকদের আমন্ত্রণে আনুমানিক ১০৪০ সালে তিনি বিক্রমশীলা ছেড়ে নেপাল হয়ে তিব্বতে যান। সেখানে লেখেন ‘বোধিপথপ্রদীপ’, ৬৭টি শ্লোকের একটি ছোট গ্রন্থ, যেখানে বৌদ্ধ সাধনার ধাপগুলো সাজানো হয়েছে এবং যা পরবর্তী তিব্বতি শিক্ষাকে প্রভাবিত করে। তাঁকে ও তাঁর শিষ্য ড্রমতোনকে কদম ধারার প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয়। তিব্বতে লাসার কাছে তাঁর মৃত্যু হয়; সূত্রভেদে সালটি ১০৫৩ বা ১০৫৪।

দেহভস্মের প্রত্যাবর্তন

১৯৭৮ সালের ২৮ জুন তাঁর দেহভস্মের একটি অংশ চীন থেকে ঢাকায় আনা হয় এবং কমলাপুরের ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে রাখা হয়, যেখানে তা আজও সংরক্ষিত। বিক্রমপুরে রঘুরামপুর ও নাটেশ্বরের খননকৃত বিহার তাঁর জন্মভূমির গল্পে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।

সূত্র: en.wikipedia.org, en.banglapedia.org, en.wikipedia.org, rigpawiki.org