বাঁশবাড়ি, কোথাও লেখা হয় বাশবাড়ি, মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার একটি গ্রাম। বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের অন্যতম সৃষ্টিশীল পরিবারের পৈতৃক ভিটা এটি। এই পরিবারের সদস্যরা অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে বেতার, চলচ্চিত্র ও জনপ্রিয় সংগীতে কাজ করেছেন।
প্রথম প্রজন্ম
পরিবারের প্রবীণ ওস্তাদ শের আলী মিয়া ছিলেন যন্ত্রশিল্পী। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে তাঁকে প্রথম উল্লেখযোগ্য বাঙালি মুসলিম যন্ত্রশিল্পী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তাঁর ভাইয়েরাও ছিলেন সংগীতশিল্পী। তাঁদের একজন সাদেক আলী গ্রামে জন্ম নেওয়া শের আলীর ছেলে ধীর আলী মিয়াকে বাঁশি শেখান।
ধীর আলী মিয়া দীর্ঘ সময় বেতারে কাজ করেছেন। ১৯৪৮ সালে তিনি সরকারি বেতারের ঢাকা কেন্দ্রে স্টাফ শিল্পী হিসেবে যোগ দেন। চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন। ১৯৫৬ সালে মুক্তি পাওয়া তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এ তিনি সহকারী সংগীত পরিচালক ছিলেন। পরে কয়েকটি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন।
১৯৬৫ সালে তিনি পাকিস্তানের তমঘা-ই-ইমতিয়াজ পান। ১৯৮৩ সালে উপপ্রধান সংগীত প্রযোজক হিসেবে অবসর নেন এবং ১৯৮৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর ৬৪ বছর বয়সে মারা যান। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সংগীতে একুশে পদক দেয়। তাঁর দুই ছেলেও সংগীতশিল্পী হয়েছেন।
চাচাতো ভাই ও ভাতিজারা
পরিবারের শাখা-প্রশাখা অনেক বিস্তৃত। একই গ্রামে জন্ম নেওয়া ধীর আলী মিয়ার চাচাতো ভাই আলাউদ্দিন আলী তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে সুর করে দেশের অন্যতম খ্যাতিমান সুরকার হন। মনসুর আলী, ইউনুস আলী ও মমতাজ উদ্দিনসহ অন্য আত্মীয়রাও সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন।
সুরকার ও বেহালাবাদক মনসুর আলীর ছেলে আলী আকবর রুপু। ১৯৬০ সালের ৩১ আগস্ট বিক্রমপুরে তাঁর জন্ম। ১৯৮০ সালে তাঁর সংগীতজীবন শুরু। ১৯৮২ সালের মধ্যে তিনি উচ্চারণ ব্যান্ডে গিটার ও কি-বোর্ড বাজাতেন। পরে কুমার বিশ্বজিৎ, এন্ড্রু কিশোর ও সাবিনা ইয়াসমিনের মতো শীর্ষ শিল্পীদের গানে সুর ও সংগীত পরিচালনা করেন। চলচ্চিত্র এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি জনপ্রিয় টেলিভিশন ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের জন্যও সংগীত তৈরি করেন। ২০১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ৫৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান।
কেন এই গল্প গুরুত্বপূর্ণ
বাঁশবাড়ির এই পরিবার ঢাকার বেতারের প্রথম যুগকে সত্তর ও আশির দশকের চলচ্চিত্রের গান এবং তার পরের ব্যান্ড ও স্টুডিও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রতিটি প্রজন্ম শহরে কাজ শুরুর আগে বাড়িতেই বাবা ও চাচাদের কাছে প্রথম তালিম পেয়েছে।
মুন্সীগঞ্জের জন্য এই পরিবার মনে করিয়ে দেয়, বিক্রমপুরের সাংস্কৃতিক অবদান শুধু লেখক ও পণ্ডিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। টঙ্গিবাড়ীর একটি গ্রামই দশকের পর দশক বাংলাদেশের বেতার ও চলচ্চিত্রের সুর জুগিয়েছে।
সূত্র: en.wikipedia.org, en.wikipedia.org, en.wikipedia.org, en.wikipedia.org