বাংলার বড় নদীগুলোর তীরের জীবন নিয়ে ‘পদ্মানদীর মাঝি’র মতো করে খুব কম বই কথা বলেছে। লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পারিবারিক শিকড় ছিল বিক্রমপুরে, যে অঞ্চলের দক্ষিণ প্রান্ত আজও পদ্মার গতিপথে বদলায়। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত উপন্যাসটিতে নদীতীরের এক গ্রামের জেলেদের জীবন উঠে এসেছে: তাঁদের ঋণ, ঝগড়া, বন্যায় ঘর হারানো আর তাঁদের শ্রমে মুনাফা করা ব্যবসায়ীদের কথা।

কাহিনি

গল্পের কেন্দ্রে দরিদ্র জেলে কুবের, যিনি পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে হিমশিম খান। তাঁর জীবন জড়িয়ে যায় স্ত্রীর বোন কপিলা এবং ব্যবসায়ী হোসেন মিয়ার সঙ্গে। হোসেন মিয়া দূরের ময়নাদ্বীপে বসতি গড়ছেন এবং জমির আশ্বাস দিয়ে গ্রামের মানুষকে সেখানে নিয়ে যান। উপন্যাসে হিন্দু ও মুসলমান জেলে পরিবারগুলো একই নদী ও একই কষ্টের ভাগীদার প্রতিবেশী। শ্রমজীবী মানুষের আবেগবর্জিত চিত্র হিসেবে উপন্যাসটি ব্যাপকভাবে পঠিত।

১৯৫৬ সালে ৪৮ বছর বয়সে মৃত্যুর আগে মানিক ৩৮টি উপন্যাস ও প্রায় ৩০৬টি ছোটগল্প লেখেন। ‘পদ্মানদীর মাঝি’ ইংরেজি, সুইডিশ, রুশ ও ইতালীয়সহ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

চলচ্চিত্র

ভারতীয় পরিচালক গৌতম ঘোষ ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় উপন্যাসটি থেকে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। পুরো দৃশ্যধারণ হয় বাংলাদেশে, দৈর্ঘ্য প্রায় ১২৬ মিনিট। ছবিটি নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মুক্তি পায়; বিভিন্ন সূত্রে সাল হিসেবে ১৯৯২ বা ১৯৯৩ উল্লেখ আছে। কুবের চরিত্রে অভিনয় করে রাইসুল ইসলাম আসাদ শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কারও পায় এবং চম্পা পান শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার।

সে সময় সমালোচকেরা নদীর চিত্রায়ণের প্রশংসা করেন, কেউ কেউ অবশ্য ছবির গতি ধীর বলে মনে করেন। পরে গৌতম ঘোষ লালনের জীবন নিয়ে ‘মনের মানুষ’ (২০১০) সহ আরও সাহিত্যভিত্তিক ছবি বানান।

বিক্রমপুরে কেন আজও প্রাসঙ্গিক

উপন্যাসের পদ্মাই আজ লৌহজংয়ের জমি ভাঙছে, আর এখন সেই নদীর ওপর দিয়ে চলে গেছে পদ্মা সেতু। নদীতীরের জেলে পরিবারগুলো আজও মৌসুমি মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা, মহাজনের ঋণ আর নদীভাঙনে জমি হারানোর মুখোমুখি। মুন্সীগঞ্জের পাঠকের কাছে তাই বইটি পুরোনো দিনের গল্প নয়, বরং জলের ধারের চেনা জীবনের বিবরণ।

সূত্র: en.wikipedia.org, en.wikipedia.org, en.wikipedia.org, en.wikipedia.org