শত শত বছর ধরে বিক্রমপুরের ইতিহাস জানা যেত মূলত তাম্রশাসন ও পরবর্তী কালের লেখা থেকে। এসব সূত্রে দেখা যায়, দশম শতকে শ্রীচন্দ্রের সময় চন্দ্র রাজাদের শাসনকেন্দ্র ছিল বিক্রমপুরে, পরে বর্মণ ও সেন রাজারাও এখান থেকে ভূমিদান করেছেন। তবে মাটির ওপর শহরটি দেখতে কেমন ছিল, তা অনেকটাই অস্পষ্ট ছিল। গত পনেরো বছরে মুন্সীগঞ্জে খনন সেই শূন্যতা পূরণ করতে শুরু করেছে।

রঘুরামপুরের বিহার

মুন্সীগঞ্জ সদরের রামপাল ইউনিয়নের রঘুরামপুর গ্রামে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি দল সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ২০১০ সালের দিকে খনন শুরু করে। ২০১৩ সালের মার্চে দলটি একটি বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার কথা জানায়। ততদিনে প্রায় সাড়ে তিন মিটার বর্গের পাঁচটি ভিক্ষুকক্ষ উন্মোচিত হয় এবং ১০০টির বেশি ভাস্কর্য ও অন্যান্য নিদর্শন উদ্ধার হয়। বিহারের পুরো আয়তন তখনো নির্ধারণ করা যায়নি।

খননকারীরা স্থানটিকে পাল যুগের বিহার এবং কাছের বজ্রযোগিনীতে জন্ম নেওয়া বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপংকরের সময়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কোনো কোনো বিবরণে একে পাল সম্রাট ধর্মপালের আমলের বলা হয়। এগুলো খনন দলের ব্যাখ্যা; এখন পর্যন্ত পাওয়া কোনো লিপিতে বিহারটির নাম নেই।

নাটেশ্বরের স্তূপ

কয়েক কিলোমিটার দূরে টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নাটেশ্বরে ২০১২ ও ২০১৩ সালে কাজ শুরু হয়। ২০১৪ সাল থেকে চীনের হুনান প্রদেশের সাংস্কৃতিক নিদর্শন ও প্রত্নতত্ত্ব ইনস্টিটিউট প্রকল্পে যুক্ত হয়। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে দলটি জানায়, চারটি পরস্পরযুক্ত হলঘরে ক্রুশাকার নকশায় সাজানো ১৬টি স্তূপ পাওয়া গেছে। সঙ্গে মিলেছে একটি অষ্টভুজ স্তূপ, একটি মন্দির, ইট বিছানো রাস্তা ও নালা এবং লাল ও কালো মৃৎপাত্র। খনন পরিচালক নূহ-উল-আলম লেনিন এবং গবেষণা পরিচালক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান কাজের নেতৃত্ব দেন।

দলটি ২৬টি কাঠকয়লার নমুনা যুক্তরাষ্ট্রের বেটা অ্যানালিটিক পরীক্ষাগারে পাঠায়। খননকারীদের মতে, ফলাফলে বসতির দুটি পর্ব দেখা যায়: আনুমানিক ৭৮০ থেকে ৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ এবং ৯৫০ থেকে ১২২৩ খ্রিষ্টাব্দ। পরের মৌসুমগুলোতে একটি বড় পিরামিড আকৃতির স্তূপ উন্মোচিত হয়, যাকে দলটি বাংলাদেশে এ ধরনের একমাত্র স্তূপ বলে বর্ণনা করেছে।

অমীমাংসিত প্রশ্ন

এসব আবিষ্কার নিশ্চিত করে যে বিক্রমপুর কয়েক শতাব্দী ধরে গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ কেন্দ্র ছিল। তবে দুটি স্থান রাজধানীর সঙ্গে এবং তিব্বতি ও সংস্কৃত গ্রন্থে উল্লিখিত বিহারগুলোর সঙ্গে ঠিক কীভাবে সম্পর্কিত, তা এখনো নির্ধারণের কাজ চলছে। খননের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ এবং বৃষ্টি ও বন্যা থেকে উন্মুক্ত ইটের কাঠামো রক্ষা করা গেলে আরও অনেক কিছু জানা সম্ভব হবে।

সূত্র: en.wikipedia.org, en.wikipedia.org, en.wikipedia.org