মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরী নদীতে যখন লম্বা বাইচের নৌকা ছুটে চলে, তখন তীরে শুধু বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ পৌঁছায় না। ভেসে আসে মাঝিদের গানও। এই গানের নাম সারি গান। বাংলার সবচেয়ে পুরোনো কাজের গানের একটি এটি।

শ্রমের গান

সারি গানের জন্ম শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে মাঝি ও শ্রমিকদের মধ্যে, আজকের বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। দল বেঁধে বৈঠা বাওয়া, টানা বা অন্য কাজের সময় এই গান সবাইকে একসঙ্গে তালে রাখত। তাই এর জোরালো ও নিয়মিত ছন্দ কথার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত একজন মূল গায়েন পঙ্‌ক্তি ধরেন, আর দলের বাকিরা দোহারে সাড়া দেন।

অনেকে সারি গানকে ভাটিয়ালির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। দুটি আলাদা ধারা। ভাটিয়ালি নামটি এসেছে ভাটা থেকে। ভাটির টানে ভেসে চলা মাঝিরা এই গান গাইতেন। এটি ধীর ও ভাবুক সুরের গান এবং ব্রহ্মপুত্রের তীরের ময়মনসিংহ অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে সারি গান পরিশ্রম ও দলগত কাজের গান, যা নৌকাবাইচের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

নৌকাবাইচের মৌসুম

নৌকাবাইচ বৈঠা বেয়ে নৌকা চালানোর ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতা। একেকটি দলে সাতজন থেকে প্রায় এক শ জন মাঝি থাকতে পারেন, আর ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিষিদ্ধ। বর্ষার বৃষ্টিতে নদী ভরে ওঠার পর, মোটামুটি জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষা ও শরৎকালে বাইচ হয়। অঞ্চলভেদে নৌকাও আলাদা: ময়মনসিংহ, পাবনা ও ঢাকায় সরু কাঠের কোষা, আর ঢাকা অঞ্চলে গয়না নৌকা।

আঠারো শতকে নবাব পরিবারগুলো বাইচের আয়োজন করায় শহরেও এর জনপ্রিয়তা বাড়ে। অতীতে কোথাও কোথাও গানের সঙ্গে করতাল বাজানো হতো, যা মাঝিদের তাল রাখতে সাহায্য করত।

ধলেশ্বরীর বাইচ

মুন্সীগঞ্জে প্রতিবছর ধলেশ্বরী নদীতে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ হয়। মীরকাদিম পৌরসভা থেকে মুন্সীগঞ্জ লঞ্চঘাট পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার পথে এই প্রতিযোগিতা চলে। ২৫, ৫০ ও ৬০ জন মাঝির নৌকা এতে অংশ নেয়, আর দুই তীরে হাজারো মানুষ ভিড় করেন।

প্রবাসীদের সঙ্গে এই ঐতিহ্য বিদেশেও পৌঁছেছে। ২০০৭ সালে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডে ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা প্রথম নৌকাবাইচের আয়োজন করেন। ২০১৫ সালে আয়োজনটি বার্মিংহামে সরে যায়।

বিক্রমপুরের অনেক মানুষের কাছে এই গান ও বাইচ নদী, ঋতু আর সমাজকে এক সুতোয় বাঁধে। প্রতিবছর ধলেশ্বরীতে মাঝিদের সমবেত কণ্ঠ বাংলা সংগীতের এক প্রাচীন ধারাকে জীবন্ত রাখে।

সূত্র: en.wikipedia.org, en.wikipedia.org, en.wikipedia.org, en.wikipedia.org