বহু শতাব্দী ধরে বিক্রমপুরের মানুষ শুনে এসেছে, তাদের এই ভূমি একসময় রাজধানী ছিল, ছিল বৌদ্ধ শিক্ষার কেন্দ্র। ২০১০ সাল থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মাটি খুঁড়ে তার প্রমাণ সামনে আনছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও স্থানীয় সংগঠন অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের যৌথ খননে মুন্সীগঞ্জ সদরের রঘুরামপুরে একটি বিহার এবং টঙ্গিবাড়ীর নাটেশ্বরে একটি বড় বৌদ্ধ স্তূপ কমপ্লেক্স আবিষ্কৃত হয়েছে।
এসব আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৩ সালের মার্চে খনন দল রঘুরামপুরে একটি বিহারের ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার কথা জানায়, যেখানে ভিক্ষুদের কক্ষ এবং শতাধিক ভাস্কর্য ও নিদর্শন মিলেছে। এই কাজে অর্থায়ন করে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। নাটেশ্বরে ২০১২ সালে শুরু হওয়া খননে স্তূপ, ইটের পথ, পয়ঃনিষ্কাশন নালা ও বিহারের কক্ষ বেরিয়ে এসেছে। চীনের হুনান প্রদেশের প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বাংলাদেশি দলের সঙ্গে কাজ করছেন। নাটেশ্বরের রেডিওকার্বন পরীক্ষায় মোটামুটি ৭৮০ থেকে ১২২৩ খ্রিস্টাব্দের সময়কাল পাওয়া গেছে, অর্থাৎ এই বসতি অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের যুগের। তিনি আনুমানিক ৯৮২ সালে কাছেই বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
আবিষ্কার কেবল প্রথম ধাপ
খোলা ইটের কাঠামো ভঙ্গুর। একবার খনন হলে বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, গাছের শিকড়, অসতর্ক দর্শনার্থী আর ইট চুরি কয়েক বছরেই সেই ক্ষতি করতে পারে, যা শত শত বছর মাটির নিচে থেকেও হয়নি। মুন্সীগঞ্জ নিচু এলাকা, বর্ষায় পানি জমে। পানি নিষ্কাশন, স্পর্শকাতর অংশে আচ্ছাদন আর নিয়মিত সংরক্ষণ না হলে গত এক দশকে উন্মোচিত দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে।
সাফল্যেরও নিজস্ব চাপ আছে। সরকার জানিয়েছে, নাটেশ্বরকে দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলা হবে, একটি প্রত্নতাত্ত্বিক পার্কের পরিকল্পনাও রয়েছে। এটি স্বাগত জানানোর মতো, তবে পর্যটন আসবে সংরক্ষণের পরে, আগে নয়। খনন না হওয়া জমির ওপর কংক্রিটের হাঁটাপথ, স্তূপের পাশে খাবারের দোকান কিংবা আশপাশের ঢিবিতে নতুন ভবন এমন প্রমাণ নষ্ট করে দিতে পারে, যা এখনো কেউ গবেষণা করেননি।
সমাজকে কেন্দ্রে রাখুন
বিক্রমপুরের খননের বড় শক্তি হলো স্থানীয় মালিকানা। একটি সামাজিক ফাউন্ডেশন, একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মন্ত্রণালয় ও একটি বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করেছে, আর প্রাপ্ত নিদর্শন রাখা হয়েছে বিক্রমপুর জাদুঘরে। নতুন পর্যায়ে এই মডেলকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, পাশে সরিয়ে রাখা নয়।
আমাদের পরামর্শ
- আগে আইনি সুরক্ষা। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নিশ্চিত করুক যে খনন করা স্থান ও আশপাশের ঢিবিগুলো পুরাকীর্তি আইনের আওতায় আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত, মাঠে সীমানা চিহ্নিত এবং কাছাকাছি নির্মাণে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
- পর্যটন পরিকল্পনার আগে সংরক্ষণ পরিকল্পনা। দর্শনার্থী সুবিধা গড়ার আগে প্রতিটি স্থানের জন্য বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় সংরক্ষণ ও পানি নিষ্কাশন পরিকল্পনা প্রকাশ করা দরকার।
- গবেষণা প্রকাশ করুন। পূর্ণাঙ্গ খনন প্রতিবেদন বাংলা ও ইংরেজিতে প্রকাশ করা হোক, যাতে গবেষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী জানতে পারেন।
- স্থানীয় রক্ষক তৈরি করুন। টঙ্গিবাড়ী ও রামপালের তরুণদের সাইট রক্ষক ও গাইড হিসেবে প্রশিক্ষণ দিলে সুরক্ষায় সমাজের সরাসরি অংশীদারত্ব তৈরি হবে।
- নিয়মিত অর্থায়ন। প্রবাসী বিক্রমপুরবাসী জাদুঘর ও তার অংশীদারদের মাধ্যমে একটি সংরক্ষণ তহবিল গড়তে পারেন, যার হিসাব প্রতি বছর প্রকাশ করা হবে।
অতীশ দীপঙ্কর ১০৪০ সালে তিব্বতে যান এবং আজও বৌদ্ধ বিশ্বে সম্মানিত। তাঁর জন্মভূমির মাটি এখন স্তরে স্তরে আবার পড়া হচ্ছে। যে ধৈর্য ও যত্ন নিয়ে এগুলো উন্মোচন করা হয়েছে, রক্ষার কাজেও সেই একই ধৈর্য ও যত্ন প্রাপ্য।
সূত্র: en.wikipedia.org, en.wikipedia.org, en.wikipedia.org, archaeology.gov.bd