বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা রেকর্ড ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা আগের বছর ছিল ৩ হাজার ৩৩ কোটি ডলার। এই অর্থের বড় একটি অংশ পৌঁছায় মুন্সীগঞ্জের মতো জেলার পরিবারগুলোতে, যেখান থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছেলেমেয়েরা নিউইয়র্ক, লন্ডন থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ ও পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমিয়েছেন।

রেমিট্যান্স পরিবারের সংসার চালায়, স্কুলের বেতন ও চিকিৎসার খরচ জোগায় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তি দেয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো অর্থের ওপর ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অনানুষ্ঠানিক হুন্ডির বদলে ব্যাংক ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত মাধ্যম ব্যবহারের এটি আরেকটি কারণ।

বাড়ি থেকে উদ্যোগের পথে

তবু বিক্রমপুর ঘুরলেই দেখা যায় অর্থের বড় অংশ কোথায় যায়: উঁচু উঁচু বাড়িতে, যার অনেকগুলো বছরের বেশির ভাগ সময় তালাবদ্ধ থাকে, আর ক্রমেই দামি হয়ে ওঠা জমিতে। পরিবারের জন্য বাড়ি বানানোর ইচ্ছা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রায় সব সঞ্চয় যখন ভবন ও জমিতে চলে যায়, তখন এলাকায় থেকে যাওয়া তরুণদের কাজ দিতে পারে এমন ব্যবসায় খুব কম অর্থই যায়।

মুন্সীগঞ্জের সত্যিকারের কিছু শক্তি আছে। জেলাটি ঢাকার পাশে, আর ২০২২ সাল থেকে পদ্মা সেতুর উত্তর প্রান্তে। এখানে বিপুল পরিমাণে আলু উৎপাদন হয়, হিমাগার ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত, নদীর তীরে রয়েছে শিল্পাঞ্চল। ধৈর্যশীল ও সুপরিচালিত স্থানীয় পুঁজি এসব খাতে মূল্য যোগ করতে পারে: কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মোড়কজাতকরণ, হিমায়িত সরবরাহ ব্যবস্থা ও পরিবহন, ছোট কারখানা, ক্লিনিক ও রোগনির্ণয় কেন্দ্র, স্কুল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

আস্থাই অনুপস্থিত উপাদান

মূল বাধা অর্থ নয়, আস্থা আর দূরত্ব। অনেক প্রবাসীর অভিজ্ঞতায় আছে আত্মীয়ের হাতে অর্থের অপব্যবহার, অংশীদারের উধাও হয়ে যাওয়া কিংবা জমির লেনদেন শেষে মামলা। এই সমস্যার সমাধানই প্রবাসী পুঁজি কাজে লাগানোর চাবিকাঠি।

কিছু ব্যবস্থা ইতিমধ্যে আছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ডসহ সরকারি সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন, এবং সরকার ওয়েজ আর্নার বন্ডে বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দিয়েছে। এগুলো নিরাপদ মুনাফা দেয়, কিন্তু নিজে থেকে স্থানীয় উদ্যোগ গড়ে তোলে না।

আমাদের পরামর্শ

  • বিক্রমপুর বিনিয়োগ ডেস্ক। জেলা চেম্বার অব কমার্স ও প্রবাসী সংগঠনগুলো মিলে একটি যৌথ ডেস্ক গড়তে পারে, যা স্থানীয় প্রকল্প যাচাই করবে, জমির কাগজ পরীক্ষা করবে এবং বিদেশের বিনিয়োগকারীদের মৌলিক তথ্য দেবে।
  • যৌথ ও নিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগ কাঠামো। আত্মীয়দের অনানুষ্ঠানিকভাবে ধার না দিয়ে প্রবাসীরা নিবন্ধিত কোম্পানি বা সমবায়ের মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে পারেন, যেখানে নিরীক্ষিত হিসাব, স্বাধীন পরিচালক ও নিয়মিত প্রতিবেদন থাকবে।
  • সব সময় বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করুন। ব্যাংকে পাঠানো অর্থে প্রণোদনা মেলে, লেনদেনের স্পষ্ট প্রমাণ থাকে এবং বিরোধ হলে প্রেরক সুরক্ষা পান।
  • অর্থের সঙ্গে দক্ষতা যোগ করুন। হিসাববিদ থেকে প্রকৌশলী পর্যন্ত প্রবাসী পেশাজীবীরা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের পরামর্শ ও সুশাসনে সহায়তা দিতে পারেন, যা অনেক সময় পুঁজির চেয়েও মূল্যবান।
  • ছোট থেকে শুরু করে প্রমাণ দিন। বড় কোনো ঘোষণার চেয়ে কয়েকটি সুপরিচালিত ও স্বচ্ছ উদ্যোগ আস্থা গড়তে অনেক বেশি কাজ করবে।

রেমিট্যান্স ইতিমধ্যে বিক্রমপুরের বহু পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছে। ভালো কাঠামো গড়ে উঠলে একই অর্থ এমন উদ্যোগও তৈরি করতে পারে, যা পরের প্রজন্মকে এলাকায় থাকার কারণ দেবে, আর প্রবাসীদের দেবে ফিরে আসার কারণ।

সূত্র: bb.org.bd, bb.org.bd, customs.gov.bd, en.wikipedia.org