বিক্রমপুরসহ সারা বিশ্বে জগদীশচন্দ্র বসু বেতার তরঙ্গ ও উদ্ভিদ শারীরতত্ত্ব গবেষণার পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। তবে তিনি যে সাধারণ পাঠকের জন্য বাংলায় লিখতেন এবং তাঁর একটি গল্প বাংলা কল্পবিজ্ঞানের প্রথম দিকের রচনা হিসেবে গণ্য হয়, তা অনেকেরই অজানা।

বিক্রমপুরের পরিবারের এক বিজ্ঞানী

জগদীশচন্দ্র বসুর জন্ম ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর ময়মনসিংহে, তবে তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বিক্রমপুরের রাড়িখাল গ্রামে, যা এখন মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায়। ১৮৯০-এর দশকে তিনি বেতার তরঙ্গের আচরণ নিয়ে গবেষণা করেন, পরে উদ্দীপনায় উদ্ভিদের সাড়া নিয়ে কাজ শুরু করেন। এই কাজকে এখন উদ্ভিদের সংকেত আদান-প্রদান নিয়ে গবেষণার প্রথম দিকের ধাপ হিসেবে দেখা হয়। ১৯১৭ সালে তিনি কলকাতায় বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর গিরিডিতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এর নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি নাইট উপাধি পান এবং রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন।

ঘূর্ণিঝড় আর কেশতেল

১৮৯৬ সালে জগদীশচন্দ্র ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ নামে একটি ছোটগল্প লেখেন। গল্পের মূল ভাবনা অভিনব: ‘কুন্তলকেশরী’ নামের এক শিশি কেশতেল সমুদ্রে ঢেলে দিলে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় শান্ত হয়ে যায়। তেলের পাতলা স্তর ঢেউকে মসৃণ করে দেয়। নাবিকদের জানা একটি বাস্তব পর্যবেক্ষণ, অর্থাৎ পানিতে তেল ছড়ালে ঢেউ কিছুটা দমে যায়, তাকেই তিনি আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণের গল্পে রূপ দেন।

পরে তিনি গল্পটি সংশোধন করে ‘পলাতক তুফান’ নামে ১৯২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বাংলা প্রবন্ধ সংকলন ‘অব্যক্ত’-তে অন্তর্ভুক্ত করেন। গবেষক বোধিসত্ত্ব চট্টোপাধ্যায় দুটি সংস্করণই ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন।

এটিই কি প্রথম?

কোন বাংলা লেখাকে প্রথম কল্পবিজ্ঞান গল্প বলা উচিত, তা নিয়ে এই ধারার ইতিহাসবিদেরা একমত নন। জগদীশচন্দ্রকে প্রায়ই বাংলা কল্পবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ ১৮৮২ সালে প্রকাশিত হেমলাল দত্তের ‘রহস্য’কে সেই স্থান দেন, আর জগদানন্দ রায়ের ‘শুক্র ভ্রমণ’ও প্রথম দিকের রচনা হিসেবে গণ্য। তবে এটুকু স্পষ্ট যে বিজ্ঞানকে গল্পের চালিকাশক্তি বানানো বাংলা লেখার প্রথম প্রজন্মেই জগদীশচন্দ্রের গল্পটির স্থান।

‘অব্যক্ত’ বইয়ে জগদীশচন্দ্র গাছপালা, নদী ও দৈনন্দিন বিস্ময় নিয়ে সহজ বাংলায় লিখেছেন, যাতে বিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ নেই এমন পাঠকও তাঁর ভাবনা বুঝতে পারেন। লেখক ও বিজ্ঞানী দুই-ই জন্ম দেওয়া এই অঞ্চলের জন্য এটি মনে করিয়ে দেয় যে দুই ধারা কখনো খুব দূরে ছিল না।

সূত্র: en.wikipedia.org, en.wikipedia.org, britannica.com