সড়ক ও সেতু এই অঞ্চলের চেহারা বদলে দেওয়ার অনেক আগে মুন্সীগঞ্জের নিজস্ব একটি জমজমাট নদীবন্দর ছিল। শিক্ষক ও গবেষক রমজান মাহমুদের সাম্প্রতিক এক লেখা অনুযায়ী, মিরকাদিমের কাছে ধলেশ্বরীর তীরের কমলাঘাট একসময় বিক্রমপুরের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যঘাট ছিল। লেখাটি ৩০ অক্টোবর স্থানীয় সংবাদমাধ্যম আমার বিক্রমপুরে প্রকাশিত হয়। তাঁর দাবি, এটি ঢাকার সদরঘাট ও বাদামতলীর চেয়েও পুরোনো।
বন্দরটি সম্ভবত মোগল আমলে গড়ে ওঠে এবং ব্রিটিশ শাসনামলে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। দক্ষিণাঞ্চল থেকে নৌপথে পণ্য আসত, আর ঘাটজুড়ে গড়ে ওঠে আড়ত, গুদাম ও বাণিজ্যপ্রতিষ্ঠান, যেখানে সুপারি, নারকেল, মরিচ ও মসলা, চাল, ডাল, গুড়, তেল ও আটার কারবার হতো। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও ময়মনসিংহের পাশাপাশি কলকাতা, আসাম ও বার্মার সঙ্গে বাণিজ্য করতেন। লেখায় ইতালি, ফ্রান্স ও লন্ডন পর্যন্ত বাণিজ্যিক যোগাযোগের কথাও বলা হয়েছে।
নামটি নিয়ে স্থানীয় প্রচলিত কাহিনিটি মজার। একসময় অনেক আড়তদার কমলালেবুর ব্যবসা করতেন। নষ্ট কমলা মিরকাদিম খাল ও ধলেশ্বরীতে ফেলে দেওয়া হলে সেগুলো পানিতে ভেসে থাকত। মানুষ জায়গাটিকে কমলার ঘাট বলতে শুরু করে, যা কালক্রমে কমলাঘাট হয়ে যায়।
বাণিজ্যের কেন্দ্র প্রথমে ছিল মিরকাদিম খালের তীরের বাণিজ্যনগরী মিরকাদিম। সেই নৌপথ ভরাট হয়ে যাওয়া এবং ধলেশ্বরীর গতিপথ বদলে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা আড়ত নদীর কাছে সরিয়ে আনেন, আর এভাবেই কমলাঘাট তার পরবর্তী রূপ পায়। ব্রিটিশ আমলে বৃহত্তর মিরকাদিমের মধ্যে ছিল মিরকাদিম হাট, কমলাঘাট, রিকাবীবাজার, কাঠপট্টি, বিনোদপুর ও ফিরিঙ্গিবাজার। বাজারটি ভাগ ছিল প্রসাধনী ও শৌখিন পণ্যের মনোহারী পট্টি, গুড়ের গুড়পট্টি এবং পাইকারি বাণিজ্যের আড়তপট্টিতে।
পাল, মণ্ডল, কুণ্ডু, তালুকদার ও বসাক সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী পরিবারগুলো এখানে বড় বড় ব্যবসা গড়ে তোলে, আর রাধাশ্যাম নিকেতনের মতো স্থাপনা এখনো সেই যুগের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৪৭ সালের পর অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী চলে যান, আর নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, দুর্বল সড়ক যোগাযোগ ও সীমিত সুযোগসুবিধার কারণে বন্দরের গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে আসে।
লেখকের প্রস্তাব, কমলাঘাট, মিরকাদিম, নগর কসবা, পানাম, আবদুল্লাহপুর ও গোপালনগরকে একসঙ্গে ঐতিহ্য পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা যায়। ভাবনাটি আলোচনার দাবি রাখে, কারণ এই বন্দরের গল্প আসলে বিক্রমপুরের নদীগুলো কীভাবে একসময় একে বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করেছিল, সেই গল্প।
Photo: Syed Sajidul Islam, CC BY-SA 4.0, via Wikimedia Commons