২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা থেকে লৌহজং ও তার ওপারে যাতায়াত দ্রুত ও সহজ হয়েছে। দেশের দীর্ঘতম, ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুর শুরু মুন্সীগঞ্জে। যে জেলা বরাবর রাজধানীর পাশে থেকেও তার অংশ হয়ে ওঠেনি, তার জন্য এটি এক নতুন সুযোগ: ঢাকা থেকে দিনে গিয়ে দিনে ফেরার ভ্রমণ, অন্য জেলা থেকে সপ্তাহান্তের দর্শনার্থী, আর সন্তানদের পূর্বপুরুষের ভিটা দেখাতে চাওয়া প্রবাসী পরিবার।

এত কম দূরত্বে এত ইতিহাস খুব কম জেলাতেই আছে। মুন্সীগঞ্জ শহরে রয়েছে ইদ্রাকপুর দুর্গ, যা আনুমানিক ১৬৬০ সালে মোগল সুবাদার মীর জুমলার আমলে নদীপথে ঢাকাকে রক্ষার জন্য নির্মিত হয় এবং এখন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণে। রামপালে আছে বাবা আদম মসজিদ, সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহের আমলে ১৪৮৩ সালে নির্মিত ছয় গম্বুজের ইটের মসজিদ। টঙ্গিবাড়ীতে দাঁড়িয়ে আছে সোনারং জোড়া মঠ, যার নির্মাণ শেষ হয় ১৮৪৩ ও ১৮৮৬ সালে। কাছেই নাটেশ্বর ও রঘুরামপুরের বৌদ্ধ প্রত্নস্থল, আর অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জন্মস্থান বজ্রযোগিনী গ্রাম।

পরিকল্পনাহীন পর্যটন ক্ষতি করে

পর্যটন গাইড, মাঝি, রাঁধুনি, কারুশিল্পী আর অতিথিকে ঘরে জায়গা দেওয়া পরিবারগুলোর আয়ের পথ খুলে দিতে পারে। আবার যা দেখতে মানুষ আসে, সেটিকেই নষ্ট করে দিতে পারে। আবর্জনা, দেয়ালে লেখা, উপাসনালয়ে উচ্চস্বরে জমায়েত, পুরোনো দেয়াল ঘেঁষে দোকান আর সরু গ্রামীণ সড়কে যানজট দেশের নানা ঐতিহ্যবাহী স্থানে পরিচিত সমস্যা। বিক্রমপুরের উচিত সেই ভুলগুলো থেকে শেখা, পুনরাবৃত্তি করা নয়।

এখন এসব স্থান দেখতে চাইলে দর্শনার্থীকে বেশ বেগ পেতে হয়। নির্দেশক চিহ্ন কম, তথ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, খোলার সময় অস্পষ্ট আর গণশৌচাগার প্রায় নেই। স্থানগুলোকে এক দিনের গোছানো ভ্রমণে যুক্ত করার মতো কোনো নির্দিষ্ট পথও নেই।

আমাদের পরামর্শ

  • বিক্রমপুর ঐতিহ্য পথ। জেলা প্রশাসন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও উপজেলা পরিষদগুলো মিলে প্রধান স্থানগুলো যুক্ত করে একটি চিহ্নিত পথ ঠিক করতে পারে, সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজিতে ছাপা ও অনলাইন মানচিত্র।
  • স্থানীয় গাইড প্রশিক্ষণ। প্রতিটি উপজেলার তরুণদের প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধন দিয়ে গাইড হিসেবে গড়ে তোলা যায়, যাতে দর্শনার্থীরা নির্ভুল ইতিহাস শোনেন এবং আয় এলাকাতেই থাকে।
  • আগে মৌলিক সুবিধা। নতুন ফটক বা আলোকসজ্জার চেয়ে প্রতিটি স্থানে পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, খাবার পানি, স্থাপনা থেকে দূরে পার্কিং আর ময়লার ঝুড়ি অনেক বেশি জরুরি।
  • উপাসনালয়ের মর্যাদা রক্ষা। যেসব মসজিদ ও মন্দিরে এখনো উপাসনা হয়, সেখানে পরিচালনা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে পোশাক, ছবি তোলা ও নামাজ বা পূজার সময় নিয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকা দরকার।
  • নদী ও খাবারকে যুক্ত করুন। পদ্মা ও ধলেশ্বরীতে নৌভ্রমণ, স্থানীয় মিষ্টি ও মৌসুমি খাবার ভ্রমণের অংশ হতে পারে, যা পরিচালনা করবেন স্থানীয় মানুষ।
  • প্রবাসীদের ঘরে ডাকুন। বিদেশের সংগঠনগুলো শীতের ছুটিতে দ্বিতীয় প্রজন্মের পরিবারগুলোর জন্য স্থানীয় গাইড ও হোমস্টে ব্যবহার করে ঐতিহ্য ভ্রমণের আয়োজন করতে পারে।

বিক্রমপুরের ইতিহাস তাদের সবার, যারা এই মাটিকে নিজের বলে মনে করেন, তারা টঙ্গিবাড়ীতে থাকুন কিংবা কুইন্সে। যত্নশীল পর্যটন এই ইতিহাস রক্ষার খরচ জোগাবে, অযত্নের পর্যটন একে নিঃশেষ করবে। দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বাড়ার আগেই সিদ্ধান্তটা নিতে হবে।

সূত্র: en.wikipedia.org, en.wikipedia.org, en.wikipedia.org, en.wikipedia.org