বাংলাদেশে আলুর জন্য সবচেয়ে পরিচিত জেলাগুলোর একটি মুন্সীগঞ্জ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৫-২৬ মৌসুমে জেলায় প্রায় ৩৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সামান্য বেশি। কোনো কোনো এলাকায় হেক্টরপ্রতি ফলন ৪২ থেকে ৪৫ টন পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই জমির বেশির ভাগই সদর, টঙ্গিবাড়ী ও সিরাজদিখান উপজেলায়।

ভালো ফলন সব কৃষকই চান। কিন্তু সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোতে সারা দেশে বড় ফলনের কারণে হিমাগার দ্রুত ভরে গেছে এবং তোলার সময় মাঠপর্যায়ে দাম পড়ে গেছে। সংরক্ষণের জায়গা ফুরিয়ে গেলে অপেক্ষা করার সামর্থ্য না থাকা ক্ষুদ্র কৃষকেরা আগেভাগে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। তখন বাম্পার ফলনও লোকসানে পরিণত হতে পারে।

এক মৌসুমকে ঘিরে গড়া ব্যবস্থা

মুন্সীগঞ্জের আলু অর্থনীতি নির্ভর করে স্বল্প সময়ের ফসল তোলা, হিমাগারের শৃঙ্খল, মজুত করে রাখা ব্যবসায়ী এবং সারা বছর আলু খাওয়া ভোক্তার ওপর। প্রতিটি ধাপেই দুর্বলতা আছে। ক্ষুদ্র চাষিদের জন্য হিমাগারের ভাড়া বড় বোঝা। সংরক্ষণের মাসগুলোতে লোডশেডিং মজুত আলুকে ঝুঁকিতে ফেলে। বেশির ভাগ কৃষক খাবার আলুর জাত চাষ করেন, যার প্রক্রিয়াজাতকারী বা বিদেশি ক্রেতাদের কাছে চাহিদা কম। ফলে দেশের বাজার ভরে গেলে বিক্রির আর কোনো জায়গা থাকে না।

তবে ভালো কিছু উদ্যোগের লক্ষণও আছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বিদ্যুৎ ছাড়াই চলে এমন কম খরচের মডেল আলু সংরক্ষণাগার তৈরি করেছে, যেখানে প্রাকৃতিক বায়ুচলাচল ও বাঁশের তাক ব্যবহার করা হয় এবং প্রতিটিতে প্রায় ৩০ টন পর্যন্ত আলু রাখা যায়। সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানির উপযোগী জাত চাষেও উৎসাহ দিয়েছেন। ফসলের আকারের তুলনায় এসব উদ্যোগ ছোট, তবে সম্ভাবনা দেখায়।

আমাদের পরামর্শ

  • ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য সংরক্ষণাগার। বিদ্যুৎবিহীন মডেল সংরক্ষণাগার মুন্সীগঞ্জেও সম্প্রসারণ করা হোক, কৃষক দল বা সমবায়ের জন্য, যাতে ক্ষুদ্র চাষিরা ফসলের একটি অংশ কয়েক মাস ধরে রাখতে পারেন।
  • হিমাগারে ন্যায্য প্রবেশাধিকার। জেলা প্রশাসন ও হিমাগার মালিকেরা প্রতি মৌসুমের শুরুতে ভাড়া ও খালি জায়গার তথ্য প্রকাশ করুন, এবং ক্ষুদ্র চাষিদের জন্য জায়গার একটি অংশ সংরক্ষিত রাখুন।
  • নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ। সংরক্ষণের মাসগুলোতে হিমাগারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হোক, আর মালিকদের সৌরবিদ্যুৎ ও বিকল্প ব্যবস্থায় বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হোক।
  • প্রক্রিয়াজাতকারী ও বিদেশি ক্রেতার জন্য চাষ। সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ক্রেতারা কৃষকদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানিযোগ্য জাত চাষে কাজ করতে পারেন।
  • স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজন। স্থানীয় ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা চিপস, ফ্লেক্স ও স্টার্চ তৈরির ছোট কারখানায় বিনিয়োগ করতে পারেন, যা কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং বাড়তি ফসল কাজে লাগাবে।
  • ভালো তথ্যসেবা। মুন্সীগঞ্জের কৃষকদের প্রতিদিনের দাম ও হিমাগারের খালি জায়গার খবর জানাতে একটি সহজ মোবাইল সেবা আতঙ্কে বিক্রি কমাবে।

আলু মুন্সীগঞ্জকে সারা দেশে পরিচিত করেছে। এখানকার কৃষকেরা দেখিয়েছেন, তাঁরা বেশি ফলাতে পারেন। এখন কাজ হলো নিশ্চিত করা যে বেশি ফলন মানে বেশি আয়ও।

সূত্র: dae.gov.bd, dam.gov.bd, en.wikipedia.org